Home Uncategorized Taslima Nasrin: “এই জীবনে আর দেশে ফেরা হবে না!” দীর্ঘ ১৯ বছর পর প্রাণের শহর কলকাতায় ফিরে আক্ষেপ তসলিমার

Taslima Nasrin: “এই জীবনে আর দেশে ফেরা হবে না!” দীর্ঘ ১৯ বছর পর প্রাণের শহর কলকাতায় ফিরে আক্ষেপ তসলিমার

by News On Time Tripura
0 comment

দীর্ঘ ১৯ বছর পর প্রাণের শহর কলকাতায় তসলিমা নাসরিন

দীর্ঘ প্রায় উনিশ বছরের সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। অবশেষে নিজের একসময়ের ভীষণ প্রিয় শহর, প্রাণের শহর কলকাতায় পা রাখলেন নির্বাসিত এবং বহুল চর্চিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বসবাস করছিলেন। সেখান থেকেই বিমানবন্দর হয়ে তিনি সোজা এসে উঠেছেন কলকাতার অন্যতম এক প্রথম সারির বিখ্যাত হোটেলে। আগামী ১ এবং ২ অগাস্ট— এই দু’দিন তিলোত্তমায় তাঁর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে তার আগেই নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি লেখিকা। সংবাদমাধ্যম এবিপি আনন্দের প্রতিনিধির মুখোমুখি হয়ে তিনি নিজের মনের কথা, দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ এবং সর্বোপরি কলকাতায় ফিরতে পারার আনন্দ বিস্তারিতভাবে ভাগ করে নিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারকেও আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন।

ফিরে আসার অপ্রত্যাশিত আনন্দ কলকাতায় ফিরতে পারাটা যে তাঁর কাছে কতটা আনন্দের এবং একই সঙ্গে বিস্ময়ের, তা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। তসলিমা জানিয়েছেন যে, এই উনিশ বছরে কলকাতার ভোল অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। আগের সেই চেনা শহরের সঙ্গে বর্তমানের এই শহরের অনেক পার্থক্য। কিন্তু বাহ্যিক পরিবর্তন যাই হোক না কেন, দীর্ঘ এতগুলো বছর পর এই শহরের মাটিতে ফের পা রাখতে পেরে তিনি রীতিমতো আবেগাপ্লুত। একটা সময় তিনি প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন হয়তো আর কোনোদিনও এই শহরে ফেরা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। এই অসাধ্য সাধন করার নেপথ্যে থাকা মানুষটির কথাও তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। সেক্যুলার মিশন ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য ওসমান মল্লিকের বিশেষ আমন্ত্রণেই তাঁর এই কলকাতা সফর। একটি কবিতা পাঠের আসরে যোগ দেওয়ার জন্য ওসমান মল্লিকই তাঁকে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁর কলকাতায় আসার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। এর জন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের কাছে তিনি প্রয়োজনীয় আবেদনও জানিয়েছিলেন। তসলিমা তাই ওসমান মল্লিক এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার— উভয়কেই তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ও মৌলবাদীদের প্রসঙ্গ কলকাতায় ফিরে স্বাভাবিকভাবেই নস্টালজিক হয়ে পড়েন লেখিকা। একসময় এই প্রগতিশীল শহরেই তিনি নিজের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে, এই প্রাণের শহর ছেড়েও তাঁকে একদিন চলে যেতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি তাঁর নিজের দেশ বাংলাদেশের কথাও তুলে ধরেন। আজ থেকে প্রায় ৩২ বছর আগে তাঁকে বাংলাদেশ থেকে কার্যত তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে তসলিমা বলেন যে, বাংলাদেশ এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘জেহাদিস্থান’ এবং মৌলবাদীদের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, যারা বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার বা মুক্তচিন্তায় বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না, তারাই দেশজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল। মৌলবাদীরা তাঁর ফাঁসির দাবি তুলেছিল, এমনকি তাঁর মাথার দাম পর্যন্ত ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সেই কঠিন সময়ে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তাঁর পাশে না দাঁড়িয়ে ওই মৌলবাদী শক্তিগুলোর পক্ষ নিয়েছিল এবং তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল।

কলকাতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর কলকাতা তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল। তসলিমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, কলকাতা এমন এক শহর যা সর্বতোভাবে গণতন্ত্র, নারীর অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং একজন লেখকের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তাই এখান থেকে তাঁকে কোনোদিনও বিতাড়িত হতে হবে না বলেই তিনি মনে করতেন। কিন্তু আজ থেকে ১৯ বছর আগে যখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং তাঁকে কলকাতা থেকেও কার্যত তাড়িয়ে দেওয়া হয়, সেই ঘটনা তাঁর কাছে ছিল চরম অকল্পনীয় এবং অবিশ্বাস্য। সেই সময় তাঁর মনে হয়েছিল, স্বাধীন মত প্রকাশের কণ্ঠরোধ করার ক্ষেত্রে এবং একজন লেখককে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গও যেন ঠিক বাংলাদেশেরই পথ অনুসরণ করেছে।

প্রগতিশীল শহরের প্রতি আস্থা তবে অতীতের সেই সমস্ত তিক্ত স্মৃতি ভুলে আজ তিনি সত্যিই ভীষণ খুশি। তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া তাঁর পক্ষে এই জীবনে আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, কলকাতায় এই ফিরে আসাটা তাঁর কাছে এক পরম প্রাপ্তি। এই প্রত্যাবর্তন যেন তাঁর সেই পুরনো বিশ্বাসকেই আজ নতুন করে প্রমাণ করে দিল যে, হাজারো রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও কলকাতা আজও প্রকৃত অর্থেই প্রগতিশীল এবং মুক্তমনা মানুষদের শহর।

You may also like