
গুজরাট:
(শিল্পী শান্তা দেব এর কলমে)
সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা যে একটি রূপকথার জগৎ সৃষ্টি করতে পারে, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে গুজরাটের নর্মদা ঘাট। এই অসাধারণ শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে আপনারা সেই সম্মিলিত সৃজনশীলতারই এক অপূর্ব বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাবেন।ত্রিপুরা রাজ্যের প্রায় ৭১ জন শিল্পীর সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও সৃজনশীল প্রয়াস ইতিমধ্যেই অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

আমি হলফ করে বলতে পারি, আপনি যদি একজন ত্রিপুরাবাসী হন এবং একবারও নর্মদা ঘাট পরিদর্শন করেন, তাহলে আপনার বুকও গর্বে ভরে উঠবে। আপনার মনে হবে, আমাদের ছোট্ট ত্রিপুরা রাজ্যের শিল্পীরাও তাঁদের সৃজনশীলতা, কল্পনা ও শিল্পভাবনার মধ্য দিয়ে একটি স্বপ্নের জগৎ নির্মাণ করতে পারেন।একটি ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরা থেকে গিয়ে গুজরাটের মতো বৃহৎ একটি রাজ্যের বুকে এমন বিশাল পরিসরে শিল্পের প্রকাশ ঘটানোর সুযোগ পাওয়া আমাদের কাছে সত্যিই অত্যন্ত সৌভাগ্য ও গর্বের বিষয়।শুধু ত্রিপুরা নয়, সারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে এই উদ্যোগ এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে।

প্রায় ৫০০ জন শিল্পী ও সহযোগী শিল্পীর নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এই অসাধারণ শিল্পকর্ম। প্রায় ১৫ হাজার বর্গফুট জুড়ে বিস্তৃত এই শিল্পসৃজনে ব্যবহৃত হয়েছে সিমেন্ট, টেরাকোটা, সিরামিক, পাথর ও স্টিলের মতো বিভিন্ন মাধ্যম। বিশেষ করে সিমেন্ট ও টেরাকোটার মিউরালগুলো দর্শকদের মন জয় করে নেওয়ার মতো। প্রতিটি কাজের মধ্যেই রয়েছে শিল্পীদের ভাবনা, শ্রম, নিষ্ঠা এবং নান্দনিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়।গত ৩০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীজি এই নর্মদা ঘাটের উদ্বোধন করেছেন। এই ঐতিহাসিক ও নান্দনিক উদ্যোগের অংশ হতে পেরে আমরা সত্যিই অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।

এই সম্পূর্ণ শিল্প-উদ্যোগের তত্ত্বাবধান, সমন্বয় ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আমাদেরই ত্রিপুরার একজন বিশিষ্ট শিল্পী, শ্রী সুমন মজুমদার দাদা। আমার মনে হয়, তিনি নিজে একজন শিল্পী বলেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রতিটি ক্ষেত্রে শিল্পবোধ, সৃজনশীলতা ও নান্দনিকতার এত সুন্দর সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন। তাঁর ভাবনা, পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে এতজন শিল্পীর সম্মিলিত প্রয়াস আজ এক অনন্য শিল্পরূপ লাভ করেছে।

সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, ত্রিপুরার শিল্পীরাও গুজরাটের মতো একটি বৃহৎ রাজ্যের বুকে নিজেদের শিল্পভাবনা ও কল্পনার জগৎকে এত সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। আপনারা যখন এই কাজগুলো সামনাসামনি দেখবেন, তখন হয়তো আমাদের এই অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারবেন।ত্রিপুরা রাজ্য থেকে যাঁরা এই উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শিল্পী শ্রী শঙ্কর রুদ্রপাল দাদা, শিল্পী শ্রী প্রণব রায় দাদা, শিল্পী সুপ্রিয় দা, বাসু দা এবং আমি নিজেও। এছাড়াও ছিলেন দীপিকা, বিভু, প্রীতম, মাধুরী, চঞ্চলা, রাজেশ, দীপতনু, জয়দীপ, মনীষা, বিকি, ওপেল, কনিষ্ঠ এবং আরও অনেকে। প্রত্যেকের শ্রম, নিষ্ঠা ও সৃজনশীল অবদান এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে সমৃদ্ধ করেছে।এছাড়াও ত্রিপুরা রাজ্যের আর্ট কলেজ থেকে প্রায় ১৫ জন ছাত্রছাত্রী এই কাজে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছে। তাদের এই অংশগ্রহণের জন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ শ্রী অভিজিৎ ভট্টাচার্য স্যার এবং ভাস্কর্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডঃ দেবব্রত দাস স্যারকে।

তাঁদের আন্তরিক সহযোগিতা, উৎসাহ ও মূল্যবান দিকনির্দেশনা আমাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে আরও সাফল্যমণ্ডিত করেছে।এছাড়া সারা ভারতবর্ষ থেকে যেসব আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করেছিল সেই কলেজগুলো হলো জে জে স্কুল অফ আর্ট,বি এইচ ইউ,কাশী বিদ্যাপীঠ, আই কে এস বি বি খয়রাগড়,কলাভবন শান্তি নিকেতন, কোলকাতা গভর্মেন্ট আর্ট কলেজ আরো অনেক।

BLW, NEZCC, Ministry of Culture এবং Government of Gujarat-এর যৌথ উদ্যোগ ও সহযোগিতায় নর্মদা ঘাট আজ এক অপূর্ব নান্দনিক সৌন্দর্যে সেজে উঠেছে।এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকটি বিভাগ, সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সকল আধিকারিকের প্রতি শিল্পীদের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আপনাদের সহযোগিতা, আস্থা এবং শিল্পীদের কাজের সুযোগ করে দেওয়ার মানসিকতা রয়েছে বলেই আমাদের মতো শিল্পীরা এত বড় একটি সৃজনশীল উদ্যোগের অংশ হতে পেরেছি।

সবশেষে আবারও বিশেষভাবে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই এই উদ্যোগের কো-অর্ডিনেটর ও কিউরেটর শ্রী সুমন মজুমদার দাদাকে। দাদার পরিকল্পনা, ভাবনা, নিরলস প্রচেষ্টা এবং আন্তরিক উদ্যোগের ফলেই এতজন শিল্পী এক ছাদের তলায়, এক লক্ষ্যে, একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁর এই উদ্যোগ আমাদের প্রত্যেকের শিল্পীজীবনের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করে রাখবে।শিল্পের কোনও সীমানা নেই। শিল্প মানুষকে একত্রিত করে, সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে এবং ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে এক আত্মিক বন্ধন তৈরি করে। নর্মদা ঘাটের এই সম্মিলিত শিল্পপ্রয়াস তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।আবারও এই মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক শিল্পী, সহযোগী, সংগঠক, কর্মকর্তা এবং শুভানুধ্যায়ীকে জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।গর্বিত আমি, গর্বিত আমার ত্রিপুরা।সকলকে জানাই আন্তরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা

